তবুও বন্ধু… মন হলো না আপন…

অনেক্ষণ ধরে বসে আছি শায়মাদের ড্রয়িং রুমে। ওর দেখাই নেই। বসতে বসতে আমার পায়ে ঝিঝি ধরে গেছে। আমি পায়ের ঝিঝি কাটানোর জন্য হাঁটতে থাকি রুমের এ মাথা থেকে ও মাথায়। দেয়ালের এক পাশ পুরোটা জুড়েই একটা অয়েল পেইন্টিং, এক নগ্ন বক্ষা নারী স্নান করছে। পুরো নগ্ন বক্ষা বোধ হয় বলা ঠিক না, আধাআধি, অল্প একটু পানির নিচে তার সৌন্দর্য। আমি ছবিটা দেখতে থাকি। এবারেই যে নতুন দেখছি তা নয়। কত শত বার যে দেখেছি! তারপরও পুরানো হয় না।

এর মধ্যে ওদের আনোয়ারা বুয়া এক কাপ চা নিয়ে আসে। ঠান্ডা চা, এই মহিলা কখনোই আমাকে গরম চা দিতে পারেনি। ইচ্ছে করে দেয় কিনা কে জানে! আমার ইচ্ছে করে একদিন জিজ্ঞেস করি।

আজ আমাদের একটা বিশেষ কাজ আছে। শিমুল ভাইয়ার সাথে দেখা করতে যাবো। আমরা এক সাথে একই পাড়ায় থেকেছি। এরপর ভাইয়া এইচ এস সি শেষ করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বাইরে চলে যায়। আমি ভাইয়ার মুখটা মনে করতে চেষ্টা করি। কিছুই মনে আসে না।
রেগে গেলে আমাকে বলতো, এই কালী। শুনে তো আমি কেঁদে কেটে অস্থির হয়ে যেতাম। এখন তো মজাই লাগে। সেদিন ক্লাসেই কালো রঙ খুঁজছিলো কে যেন। আমিই বললাম, এই কার কালো রঙ লাগবে? আমার থেকে নিয়ে যা।

শিমুল ভাইয়ার কথা মনে পড়তেই আমার বুকটা ধড়পড় করতে থাকে। অস্থির লাগতে শুরু করে। আমি অস্থিরতা কাটানোর জন্য শায়মার রুমের দিকে যাই। পেছন থেকে ওর কচু পাতা রঙের শাড়িটা দেখতে পাই।

-এই শায়মা, আর কতক্ষণ লাগাবি? আমি যে আসলাম মাত্র এক ঘন্টা সতের মিনিট হইছে।

– এইতো, আর কিছুক্ষণ। বলেই আমার দিকে ঘুরলো।

– তোরে তো অপ্সরার মতো লাগছে। কচু পাতা রঙের কোন শাড়ি যে কোন নারীকে এত সুন্দর বানিয়ে দিতে পারে ধারণা ছিলো না।

– কেন! আমি কী এম্নিতে সুন্দর না?

আমি এবার চুপ করে যাই। শায়মা খুব সুন্দর! আমরা সব বন্ধুরা ওকে অপ্সরা ডাকি। ও ভালো গান গায়, নাচ করে। ভার্সিটিতে যে কোন ফাংশানেই অথবা কোন কারণ ছাড়াই ওর গান গাওয়া লাগে।

– আজও কী তুই তোর এই রঙ ওঠা জিন্সটা ছাড়তে পারলি না। অনেক দিন পর শিমুল ভাইয়া আসতেছে।

শিমুল ভাইয়ার নাম শুনেই আমার বুকের ভেতরটা আবার ধকধক শুরু করে।

পৌনে দুই ঘন্টা সাজ নামক কর্ম শেষ হওয়ার পর শায়মা আর আমি বের হই।
অন্য দিনগুলোতে শায়মার সাথে কোথাও যাওয়াটা আমি এড়াই। এত দামী গাড়িতে বসলে কেন যেন অস্বস্তি লাগে। এর চেয়ে বাসের মধ্যে ঠেলাঠেলিতেও আমি স্বস্তি পাই।

বেশি ধনী আমার ভালো লাগে না। ধনী কোন আত্মীয় স্বজনদের বাসায়ও আমি বেড়াতে যাই না। শুধু এই নিয়মটা শায়মার জন্যই টিকে নি। শায়মা আমার খুব ভালো বন্ধু। আমিও ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু।

শিমুল ভাইয়া এখন দেখতে কেমন হয়েছে কে জানে! শায়মার সাথে যোগাযোগ ছিলো। ওরা কি ভালোবাসে দুজন দুজনকে ? কখনো কি ভালোবাসার কথা বলেছে? ভাবতেই গলাটা শুকিয়ে ওঠে।
– এই সুলতানা, কী হয়েছে? হঠাৎ এমন লাগছে কেন তোকে?
– কই, কিছুনা তো।
– এসে গেছি, নাম এখন।

সামনে যাকে দাঁড়ানো দেখি তাকে দেখেই পৃথিবীটা একটু দুলে ওঠে। শায়মা আর শিমুল ভাইয়া কী সব বলে, আমার মাথায় আর তেমন কিছুই ঢোকে না। আমি আমার সামনে দাঁড়ানো পৃথিবীর সবচেয়ে সুপুরুষটাকে দেখতে থাকি।

শিমুল ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলে,আরে, সুলতানা, না?
আমার দুলে ওঠা পৃথিবী প্রবলবেগে দুলতে থাক……

শায়মার কথা……
দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ বছর পর শিমুলের সাথে আজ সামনা সামনি দেখা হতে চলেছে। আমাদের গাড়িটা ওদের গাড়িবারান্দায় ঢুকতেই দেখতে পেলাম শিমুলকে, ওদের সেই অতি পরিচিত ঝকঝকে সবুজ ভেলভেট কার্পেটের মত লনে বসে ছিলো শিমুল, আন্টি আঙ্কেলও ছিলেন সেখানে। লনে গেঁথে দেওয়া সেই সুদৃশ্য পাথরের টি টেবল চেয়ারে বিকালের চা খাচ্ছিলো সবাই ওরা। আমাদেরকে দেখে এগিয়ে এলো শিমুল। ওকে দেখে আমার বুকের মাঝে দ্রিম দ্রিম ড্রামের শব্দ শুরু হলো! সাথে মনের মাঝে তখন গুনগুন সুর, আমার হৃদয় তোমার আপন হাতে দোলে, দোলাও দোলাও দোলাও…… শিমুল আমার দিকে তাকিয়ে সুলতানাকে আড়াল করে এক চোখ টিপ দিতেই আমার ঘোর কাটলো। আমি তড়িঘড়ি ওর পেছনে লনে বসে থাকা আন্টি আঙ্কেলের দিকে এগুতে গেলাম।

এ কয়েক বছর একমাত্র ছেলের সাথে সাথে আন্টি আঙ্কেলও পাড়ি জমিয়েছিলো সুদূর ইউএসএ তে। এ বছর ঈদের ছুটি কাটাতে ওরা সবাই ফিরেছে দেশে। এতগুলো দিন শিমুলের সাথে আমার যে তাই বলে দেখা সাক্ষাৎ একেবারেই ছিলো না তা নয়। ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপ আর ফোনের বদৌলতে আমার সারাটাদিনের বলতে গেলে ২৪ ঘন্টার পুরোটা সময়ই কেটেছে শিমুলের সাথে। তারপরও এতগুলো দিন পর ওর সাথে সামনা সামনি দেখা হবার এই আনন্দ মুহুর্ত গুনছিলাম আমি গত তিনমাস ধরে।

যদিও অনলাইনে ওর হাজার হাজার ছবি দেখেছি আমি, তবুও আজ হঠাৎ ওকে সামনা সামনি দেখে আমি বেশ চমকে গেলাম! শিমুলের এ ক’বছরে আচার আচরণ, বেশ ভুষায় এত বেশী পরিবর্তন হয়েছে যে অবাক না হয়ে পারা যায় না। শিমুল যেন একেবারেই হলিউডের নায়ক বনে গেছে!!! ধবধবে সাদা নাইক টি শার্ট আর এ্যাশ কালার জিন্সে ওকে লাগছিলো যেন ওয়েস্টার্ন ম্যুভির হিরো! যাহ! ভাবতেও লজ্জা লাগছে আমার। আসলে একটু না ওকে সামনে দেখে আমি তখন লজ্জায় শেষ। আমার রাঙ্গা হয়ে ওঠা ব্যাপারটা শিমুলও খেয়াল করেছিলো মনে হয়। সে দুষ্টুমি করে বলে উঠলো, কি রে গালে তরমুজ মেখে এসেছিস নাকি! আমি আরও লজ্জা পেয়ে গেলাম, রাগও লাগলো একটু। এতদিন পরে সামনা সামনি দেখা তবুও ও আমাকে তুই করেই বলছে।

শিমুল বরাবরের মত আমাকে খেপাতে শুরু করলো।
-বিশ্বাস কর তোকে দেখে একেবারেই সবুজ খোলসে লালটু গালের তরমুজ লাগছে… মানে আমার সবুজ শাড়িটার খোটা দিলো… আরও কি কি সব বলতে লাগলো ও…..
আমি রাগ করে ওদেরকে রেখেই আন্টি আঙ্কেলের দিকে এগুলাম। আন্টি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, মায়ের কথা জিগাসা করলেন। বললেন, খুব শিঘ্রী আজ কালের মধ্যেই আমাদের বাড়িতে যাবেন উনারা। আসলে আন্টি কিসের ইঙ্গিত দিলেন আমি বুঝতে পারছিলাম। আর এই ইঙ্গিতে আমি লজ্জায় তরমুজ থেকে এবারে স্ট্রবেরী হয়ে গেলাম। দেখলাম শিমুলটা আরও মজা পেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।

আন্টি ভেতর থেকে আমার জন্য আনা নানা উপহার নিয়ে এলেন। চকলেট বক্স, জুয়েলারী, গরম কাপড়, স্কার্ফ কত্ত কিছু!!! আমার খুবই লজ্জা লাগছিলো। শিমুল চকলেট বক্সগুলো থেকে কয়েকটা তুলে নিয়ে সুলতানাকে দিলো। বললো, সুলতানা তুমি এগুলো খাবে নইলে শায়মা তো একাই এসব সাবাড় করে মোটি ভুতনী হয়ে যাবে! আমরা ওর শুভাকাংখীরা কি ওর এত বড় সর্বনাশ করতে পারি বলো? সবাই হো হো করে হেসে উঠলো শুধু সুলতানার হাসিটা ম্লান ছিলো। আমার বুকের ভেতরে মুচড়ে উঠলো।

সুলতানা মনে হয় একটু কষ্ট পেয়েছে, আন্টির কোনো খেয়ালই নেই যে আমি আমার প্রিয় বান্ধবী সুলতানাকেও সাথে নিয়ে এসেছি। আন্টি এতক্ষনে খেয়াল করলেন তার ভুল হয়ে গেছে সুলতানাকেও তার কিছু উপহার না দেওয়াটা খুব ভুল হয়েছে। তিনি তাড়াতাড়ি বললেন না না আমি সুলতানার জন্য আরও চকলেট বক্স আনছি। একটু অপেক্ষা করো মা। সুলতানা তাড়াতাড়ি বলে উঠলো, আমি এসব চকলেট খাইনা আন্টি।

সুলতানার কথা…
চোখ বুজে সোজা…… নিউ মার্কেটের ১নং গেইট দিয়ে ঢুকে চোখ বুজে বা দিকে হাঁটতে থাকলেই …….মডার্ন …….হাসিখুশী গোঁফওয়ালা লোকটাকে বলবেন …….আপনি আঁকার সরন্জাম দিতে চান । ব্যাস আর কিছু বলতে হবেনা, রঙ …

পড়তে পড়তে যাচ্ছি। যদি আবার ভুলে যাই। এদিকটায় এত ভীড়। ঘাম, পারফিউম মিলেমিশে একাকার। একটু দাঁড়িয়ে থাকি। কী করবো ভাবছি। একটা কাজ করতে পারি। ভীড়ের মধ্যে ঢুকে গেলে ভীড়ই আমাকে ঠেলে নিয়ে যাবে। বোধ হয় তখন আর পরিশ্রম হবে না। এর মধ্যে ঘামে ভিজে একাকার। তখনই নিজের নামটা শুনতে পাই। একটু দূরে শিমুল ভাইয়ের গাড়ি, ভেতরে শায়মা। মুখে আর হাতে ডাকতে শুরু করলো। গিয়ে উঠি। এই প্রথমবার ওদের দামী গাড়িতে উঠে ভালো লাগে। নিঃশ্বাস ফেলে বলি, কই যাস?
– কেনাকাটা .. তুই ও চল।

পিংক সিটির এদিকটায় খুব আসা হয়নি। সবকিছুই সুন্দর! দেশের সবকিছুই হিসেব মতো চলে। উচ্চবিত্ত আর নিম্নবিত্ত। মধ্যবিত্তদের জন্যই সব ঝামেলা। ঝকঝকে সবকিছুই সাজানো, ঢুকলেই মনে হয় এই প্রাণহীন সবকিছুই বলে, প্রবেশ নিষেধ, প্রবেশ নিষেধ। আমি প্রবেশ নিষেধ শুনেও ঘুরে বেড়াতে থাকি ঝা চকচকে দোকান গুলোতে। গয়নার দোকানে একটা হার খুব পছন্দ হয় শায়মার। শিমুল ভাই পরিয়ে দিতে গিয়ে একটু বেশিক্ষণই ঘাড়ে হাত রাখে। দেখে আমার খুব কষ্ট হতে থাকে।

শাড়ি শায়মার খুব পছন্দ। স্টাইল ওয়ার্ল্ডের বেশ কয়টা শাড়ি পছন্দ হয়। শায়মা ট্রায়াল দিতে যায়। শিমুল ভাইয়া একটু এগিয়ে আসে।

-সুলতানা, তোমার সাথে কথা আছে।
আমি ঘাড় নাড়ি। অনবরত বকবক করতে থাকা এই আমিও চোখে চোখ রাখার সাহস পাই না।

শাড়িগুলো দেখি। নীল রঙের একটা শাড়ি পরে আছে সুন্দরী ডল। শাড়িটা এত নীল যে ছুঁয়ে দেখি।

ওদের কেনাকাটা শেষে বাড়ির কাছাকাছি যখন নামতে যাই তখনই প্যাকেটটা হাতে দেয় শিমুল ভাইয়া।
– এটা তোমার।
– কী এখানে?
– খুলে দেখ
শায়মা তখন মুখ টিপে হাসে। তারপর ওরা চলে যায়।
রাস্তায় দাঁড়িয়েই প্যাকেটটা খুলি। ভেতরে সেই নীল … আকাশের নীল, সমুদ্রের নীল … বুঝতে একটু সময় লাগে। তারপরই অপমানে ভেতরটা জ্বলতে থাকে। এক ছুঁড়ে ফেলে দিই রাস্তার পাশের নোংরার মধ্যে। একটা প্যাকেট, ভেতরে সমুদ্রের নীলে মেশানো একটা শাড়ি যা আমি কখনোই পরিনা। যার গায়ে লেখা ছিলো এগারো হাজার টাকা মাত্র। এগারো, এগারো ……

শায়মার কথা…
শিমুল আসার পর থেকে দিনগুলো কাঁটছে আমার প্রজাপতির ডানায়। সারাটাক্ষন মাথার মধ্যে শিমুল শিমুল আর শিমুল। একদম গেঁথে বসেছে পাঁজিটা। শিমুলটাও অনেক বেশি দুষ্টু হয়েছে এ ক’বছরে। সেদিন যা করলো সে সুলতানার সামনেই…….ধ্যাৎ ওকে আচ্ছা করে বকা দিয়ে দিতে হবে। ওহ! সুলতানার সাথে তো আজ আমার ওর আর্ট এক্সিবিশনে যাবার কথা ছিলো বিকাল ৪টায়। আমি শিমুলকেও নিতে চাই। ধ্যাৎ নিজের উপরই লজ্জা লাগছে! শিমুলকে ছাড়া কোত্থাও যেতে ইচ্ছেই করে না আজকাল!

রিং বেজে চলেছে। সুলতানার ফোনে সেই মন উদাস করা রবীন্দ্র সঙ্গীত!
“এই উদাসী হাওয়ার পথে পথে
মুকুলগুলি ঝরে
আমি কুড়িয়ে নিয়েছি তোমার চরণে দিয়েছি
লহ লহ করুণ করে”—

আমিও গুনগুন করি সুরের সাথে সাথে! আচ্ছা সুলতানা কি কাউকে ভালোবাসে? ও কি কখনও কারো প্রেমে পড়েছিলো। কখনও বলে না মেয়েটা। হঠাৎ ওর ফোনের এই রবীন্দ্র সঙ্গীতের সুর ভাবিয়ে তোলে আমাকে। ভাবনায় ছেদ পড়ে- ফোন তোলে সুলতানা-

– কি রে কই ছিলি! কখন থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি–
– গোসলে ছিলাম।
– আজ বিকাল ৪ টায় চারুকলায় যাবার কথা কনফার্ম করতে আর একটা কথা বলতে ফোন দিলাম তোকে। আমাদের সাথে শিমুলকেও নিতে চাই। জানিস কাল কি হয়েছে? খুবই মজার ঘটনা। র‌্যাডিসনে ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করেছি আমরা। একদম সিনেমার মত জানিস!আধো আলো আঁধারীতে আমরা দুজন সখা সখি! হাতে হাত, চোখে চোখ, মুখোমুখি!!! হা হা হা !!!! নিজেকে সিনেমার নায়িকা নায়িকা মনে হচ্ছিলো! হা হা হা হা হা হা হা হা …….

– তুই তো সিনেমার নায়িকাই….
– ধ্যাৎ! কি যে বলিস!!!! শোন না ! একটা মজার কথা! কাল ও না আমাকে কি যে সুন্দর একটা ডায়ামন্ড রিং গিফট দিয়েছে !!!!!! এত্ত সুন্দর!!!!!!!! ব্লু ডায়ামন্ড! মানে ডায়ামন্ডের দ্যুতিটা একদম নীল নীল জানিস!!!!! তোর খুবই পছন্দ হবে। নীল রং তোর খুব পছন্দ না! তোকে আজ বিকালে দেখাবো। আচ্ছা তুই কিন্তু আজকে ঐ নীল শাড়িটা পরবি ওকে!!!!!!! প্লিজ প্লিজ প্লিজ!!!!!!!!!!!!

শোন না,গত পরশু আঙ্কেল আন্টি আমাদের বাসায় আসছিলো না, তারা কিন্তু আজ ফোনে এনগেজমেন্টের দিন ক্ষন ঠিক করে ফেলেছে! এই সপ্তাহের পরের সপ্তাহে! এত্ত তাড়াহুড়া তাদের! মা রাজী হচ্ছিলোইনা, বলছিলো, আমার একমাত্র মেয়ের বিয়ে, কত শপিং আয়োজন আছে। কিন্তু আন্টি আঙ্কেল শুনবেনই না তারা যত তাড়াতাড়ি পারেন শুভ কাজ সারতে চান!!!!!!!!!
এ্যই একটা কথা শোন, কাল না …..হা হা হা …….ধ্যাৎ লজ্জা লাগছে বলতে , কাল না আমি ওকে …..প্রথম চুমু খেয়েছি…… হা হা হা হা হা …… কি যে লজ্জা লাগছিলো….. কিন্তু শিমুলটা এত দুষ্টু হয়েছে….. কিছুতেই ছাড়লোনা …….একদমই না …… হা হা হা হা……শেষে ওর কথা মানতেই হলো……

সুলতানার কথা…..
বাসা থেকে বের হয়ে গলি পেরোতেই দেখি শিমুল ভাইয়া দাঁড়িয়ে।
– তোমার সাথে কিছু কথা আছে। চল, কোথাও বসি।
আমরা গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসি।
– আরতো অল্প কিছুদিন পরেই আমাদের বিয়ে। জানো, বিয়ে নিয়ে আমার কিছু দ্বিধা আছে। বিয়ে একটা সামাজিক বন্ধন। দুজনের মধ্যে কোন টান না থাকলেও টেনে নিয়ে যেতে হয়। কিন্তু বিয়েকে আমি শ্রদ্ধা করি। যেহেতু মা বিয়ে করছে, নানী, দাদী … শায়মাকে আমি পছন্দ করি, ভালোবাসি, বিয়েও করছি। কিন্তু সাথে সাথে আমি তোমাকেও ভালোবাসি।
– সেটা কিভাবে হয়?
– হ্যাঁ হয়, যেমন ধর, তুমি গোলাপ ভালোবাস, তাই বলে রজনীগন্ধা ভালোবাসা না? অথবা অন্য কোন ফুল। ভালোবাসা একটা জৈবিক ব্যাপার, প্রথম অবস্থায় এটি শরীর থেকেই শুরু হয়, তারপর এতে অন্যান্য ফিলিংস তৈরি হয়। আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাস, আমিও তোমাকে। ইচ্ছে করলেই আমরা যে কোন জায়গায় টাইম স্পেন্ড করতে পারি। ভালোবাসতে পারি …

পুরো কথার প্রথম দিকটায় আমার চোখে জল এসে গিয়েছিলো। শেষের দিকটায় আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।
– ভালোবাসা একটা শারীরিক ব্যাপার!! আমার মুখ থেকে শুধু এ কথাটাই বের হয়।
– হ্যাঁ, অবশ্যেই। এই দেখ, তোমায় প্রমাণ দিচ্ছি। এই বলে টেবিলে রাখা আমার হাতটা টেনে নেয়। সাথে সাথেই শরীর বেয়ে শিহরণ …
– এই যে দেখ, তোমার শরীর সাড়া দিচ্ছে। তুমিও আমাকে ভালোবাস …
এতক্ষণে সম্বিত ফিরে পাই। হাতটা টেনে নিই। ধরে রাখা হাতটায় বার বার ঘসতে থাকি। এই ছোঁয়াই মুছে ফেলবো।
দৌড়ে যখন বের হয়ে আসি আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। কেউ কেউ হয়তো অবাক হয়ে তাকিয়েছে। কিছুদিন আগেই আমার এক কাজিন, যার সাথে লাক্স সুপারস্টার একজনের রিলেশন, সে আমাকে একটা চুমু খেয়েছিলো। আমি বিরক্ত হয়ে বলেছি, ওফ, অসহ্য।এক্ষুণি ছাড়ো, জীবাণু …
আর এখন কিনা আমি শুনি, ভালোবাসা মানে শরীর, ভালোবাসা মানে শরীর, ভালোবাসা মানে শরীর …

এই অপমানের শোধ তুলতেই হবে, তুলতেই হবে। যে কোন কিছুর বিনিময়ে।

এর দুদিন পরে শায়মাকে ফোন দিই।
– তোরা দুজন আসবি, আমি ছোট্ট একটা বাসা নিছি।
– বাসা নিছিস! হঠাৎ করে! কী ব্যাপার!
– আয় আগে, তারপর বলি। ঠিকানা বলে লাইন কেটে দিই।
কিছুক্ষণ পরেই ওরা হাজির। বাইরেই হয়তো শপিং করছিলো।
বিছানায় দুই পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলো অর্ক। তার থ্রি কোয়ার্টার আর একটু উপরেই উঠেছিলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম্বার ওয়ান মাতাল বলে খ্যাত ছবি আঁকিয়ে অর্ককে শায়মা সাথে সাথেই চিনতে পারলো। প্রায় হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো, কী হইছে?
-সরি, তোদের জানাতে পারি নি। এ অর্ক, আমরা এখন একসাথে থাকছি। মানে এখন আপাতত দুজন দুজনকে ভালোবাসছি। মানে দুজন টাইম স্পেন্ড করছি।
– সেকি! তুই না বলতিস ভালোবাসা অন্য কোন ব্যাপার, অন্য কিছু।
– আরে দূর, ভালোবাসা টালোবাসা বলে কিচ্ছু নেই, সবই ক্ষণিকের আবেগ। শরীরই সব।

শিমুল ভাইয়ার চোখে কী ছিলো দেখিনি। কিন্তু আমার ভেতরে ছিলো প্রশান্তি। অপমানের শোধ তোলার প্রশান্তি।
আমাকে পালাতে হবে, এখান থেকে, আমার ভালোবাসার কাছ থেকে, ভালোবাসা যদি প্রকাশ হয়ে যায়!

ওরা চলে যাবার পরে রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় বসি। ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদি।কিন্তু আমি কাঁদি নিঃশব্দে।
আমার ভেতরটা বলছে, ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি, আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।সমস্ত অভিমান উড়িয়ে দিয়ে জাপটে ধরি বলি, বিশ্বাস কর, ভালোবাসা অন্য কিছু, একদম অন্য কিছু। এক সাথে অনেককে ভালোবাসা যায় না। ভালোবাসলে ভালোবাসার জন্য সব করা যায়, এই যে এখন নিজের জীবনটাকেই বিসর্জন দিলাম।
কিন্তু আমি বিড়বিড় করে বলছি, ভালোবাসা বলে কিচ্ছু নেই। কিচ্ছু নেই …

শায়মার কথা …..
আজ আমি অনেক কেঁদেছি! কিন্তু এ কান্নার কারণ কি আমি জানিনা। অথবা জানি। কিন্তু …..
সুলতানা কি ভাবে এমন একটা কাজ করলো ভেবেই পাইনা আমি! ওর এত অধঃপতন!!! এত নীচু মানষিকতা!! ওর সাথে এতটা বছর একসাথে চলেছি কখনও ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝিনি ওর ভেতরটা এত কুৎসিৎ! এত পঙ্কিল… এত কদর্য্যতায় ভরা ছিলো…..ঐ তো আমাকে শিখিয়েছিলো ভালোবাসা মানে এক সূচীশুভ্রতা! ভালোবাসা মানে এক অমল ধবল পালে লাগা মন্দ মধুর হাওয়া…. ও আমাকে শিখিয়েছিলো কিভাবে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে হয় কিংবা সত্যিকারের ভালোবাসা কারে কয়…..

সেই সুলতানা কিভাবে এমন বদলে গেলো? কিভাবে আজ সে অনায়াসে অপকটে বলে দিলো ভালোবাসা মানে নাকি শুধুই টাইম স্পেন্ডিং, শুধুই একসাথে কিছু ভালো সময় কাটানো, শুধুই জৈবিক কিছু ব্যাপার স্যাপার! নাহ, আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে …..পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি…..আমি কিছুতেই মানতে পারিনা ……যাকে ভালোবাসি তার কাছে আমার হৃদয়ের কোনো দাম নেই, নেই আমার সূচীতার মূল্য!! নেই কোনো বিশ্বাসের দাবী দাওয়া!!!!!

আমার চোখে চলচ্চিত্রের মত ভাসতে থাকে সেই কিশোরীকাল হতে একনিষ্ঠতায় ভালোবেসে যাওয়া আমার প্রেম বা ভালোবাসার দৃশ্যগুলি। শিমুলের ইউএসএ চলে যাবার আগের দিনটিতে ওদের বাড়ির সকলের রাতের ডিনারের দাওয়াৎ ছিলো আমাদের বাড়িতে। সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোনের ঘরটিতে আমাদের চলে যাওয়া, লুকিয়ে চুমু খাওয়া আর সেই ভালোবাসার প্রমিজ! সব একের পর এক ভেসে যায়। মনে পড়ে যায়, দিনের পর দিন ফোনে, স্কাইপ বা ফেসবুক চ্যাটে ঘন্টার পর ঘন্টা আবল তাবল কথামালা, স্বপ্নে ভেসে বেড়ানো, হারিয়ে যাওয়া, কত শত অনাগত স্বপ্নের আশ্বাস!!! বছরের পর বছর আমি অপেক্ষা করেছি শিমুলের জন্য। কখনও কাউকে মনের এক কোনে ক্ষুদ্রতর ভালোলাগাতেও স্থান দেইনি আমি। আমি শুধু অপেক্ষায় থেকেছিলাম। আমার ভালোবাসার পূর্নতার অপেক্ষায়। সে ভালোবাসা পূর্নতায় রূপ দিতেই দেশে এসেছে শিমুল আর তার পরিবার। ভালোবাসার পূর্নতা নাকি বিয়ে! হা হা হা হা হা ! হঠাৎ প্রচন্ড হাসি পায় আমার!

আমার চোখে আরও অনেক কিছুই ভেসে যায়। টি এস সি এর সামনে একদিন রাস্তা পার হচ্ছিলাম আমি আর সুলতানা, হঠাৎ এক তীব্র গতীর মোটর সাইকেল কোথা থেকে যেন ছুটে আসে আমি বুঝে উঠবার আগেই আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় সুলতানা। নিজে আহত হয়, পা ভেঙ্গে বিছানায় পড়ে থাকে ৬ সপ্তাহ! আমার চোখে আরও ভাসে একবার বসুন্ধরা সিটিতে সেলিব্রেশন জ্যুয়েলারী শপে একজোড়া দুল পছন্দ করলো সুলতানা। আমারও সেটাই খুব ভালো লেগে গেলো কিন্তু আর দ্বিতীয়টা ছিলো না, সুলতানা সেটা কিনে নিলো আর আমাকেই পরিয়ে দিলো। আমার চোখে ভাসে সুলতানার সাথে এক প্লেট চটপটি ভাগাভাগি করে খাওয়ার দুপুর, এক গ্লাস লাসসি বা ঠোঙ্গায় করে চালতার আচার খাওয়া বিকেলগুলো। সারা হাতে মুখে কালী ঝুলি রঙ মেখে আমাকে আঁকতে বসা ওর গভীর মনোযোগী চেহারার মুখোচ্ছবিটি।

আর দুদিন বাদে আমার গায়ে হলুদ! তারপর বিয়ে, বৌভাত। কত শত আয়োজন, উৎসবের রমরমা পদচারনা চলছে চারিদিকে! উৎসব মুখর গমগমে চারপাশ! শিমুলের সাথে চলে যেতে হবে সব কিছু ছেড়ে। আত্মীয়, স্বজন, এই অতি পরিচিত পুরাতন ঘর দুয়ার, শহর এবং দেশ সব কিছুই আমি ছাড়তে রাজী ছিলাম শুধু আমার একমাত্র ভালোবাসার জন্য। কিন্তু আজ মনে প্রশ্ন জাগে, এ ভালোবাসা কি সত্যিই সবার কাছেই একই রকম মূল্যবান? অনেক বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন দুলতে থাকে আমার মাথার ভেতরে পেন্ডুলামের মত। আমি বুঝতে পারি আমি দিশেহারা হয়ে যাচ্ছি….আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি….

শেষ রাতে আমি চিঠি লিখতে বসি…..
তোমরা সবাই আমাকে খুব বোকা ভাবো তাইনা ! অনেক বোকা! কিন্তু আমি মনে হয় ততটা বোকা নই…..
আমি ডিসিশান নিয়েছি আমি বিয়ে করবো না। তোমার জন্য আমার শুভাশীষ রইলো ….. তোমাদের জন্যও ……

চিঠিটা ঠিক কাকে উদ্দেশ্য করে লেখা আমি নিজেও বুঝিনা……
কাল সকালে হয়তো এ প্রশ্ন ঘুরবে সবার মুখে মুখে…… কিন্তু সে উত্তর কখনও কারো জানা হবেনা…… সে উত্তর দিতে কখনও আর কেউ ফিরবে না……..

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s